পাহাড়ের রাজনীতি – দক্ষিণ বঙ্গীয় উন্নাসিকতা

পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ নেই। একে কেউ দক্ষিণ বঙ্গীয় উন্নাসিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাইলে করতেই পারে আপত্তি করব না। আজও সংক্ষেপে ক’টা কথা বলেই শেষ করব।

প্রথমত আমার অবস্থানটা পরিস্কার করি। আমি গোর্খাল্যান্ডের পক্ষপাতী নই কিন্তু পাহাড়ি বন্ধুদের পাশে আছি। গোর্খা, লেপচা, ভুটিয়া, টিবেটান ও অন্যান্য আদিবাসী যাদেরই জীবন জীবিকা পাহাড়ের সাথে জড়িত তাদের প্রতি সহমর্মী। গোর্খাল্যান্ড কে ইশ্যু করে গুটিকয়েক বিশ্বনিন্দুক বাঙালি যেভাবে জাতিবিদ্বেষ তৈরি করতে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে তাদের কর্মকান্ডকে সমর্থন করি না। গোর্খারা ছোট জনগোষ্ঠী তাই তারা সফট টার্গেট এবং কলকাতায় বসে ওদের গোষ্ঠী উদ্ধার করলে সাম্প্রদায়িক বা বর্ণবিদ্বেষী ট্যাগ খাওয়ারও ভয় নেই। বাংলার মুদ্রন ও বৈদ্যুতিন মাধ্যম থেকে শুরু করে ফেসবুক-টুইটার সর্বত্র গোর্খাদের কোণঠাসা করতে এক শ্রেণীর বাঙালি ইদানিং অতি সক্রিয়। আমার একটি ছোট প্রশ্ন আছে, গোর্খাদের আরেকজন বাঙালির মতো যদি আপন না করতেই পারি তবে গোর্খাদের বাসভূমি কোন নৈতিকতায় বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে থাকবে এই দাবি করবো?

এবার গোর্খাল্যান্ড দাবি মেনে নেওয়া কেন সম্ভব নয় সে প্রশ্নে আসছি। আমি “বাঙালি জাতীয়তাবাদী” নই তাই আমার রাজ্য খন্ডিত হলে আমার সুপার ইগো ও আধিপত্যবাদ আহত হবে না সেই প্রসঙ্গে আসবও না বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আর গোর্খা সমেত দার্জিলিঙের অন্যান্য উপজাতিদের স্বার্থের দিক দিয়ে বিচার করলে গোর্খাল্যান্ড কেন সর্বনাশা হবে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব।

দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারত জড়িত। দার্জিলিং ও নতুন হওয়া কালিম্পং জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নেপাল থেকে আগত সেটলার। যাদের বিভিন্ন ক্ল্যানের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত হলেও মোটামুটি ভাবে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হল নেপালি। অর্থাৎ নেপালের সাথে প্রস্তাবিত গোর্খাল্যান্ডের একটি সাংস্কৃতিক ও আত্মিক যোগাযোগ যে আছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নেপাল যদিও ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং দুই দেশের অসংখ্য নাগরিক একে অপরের দেশে স্থায়ী বা অস্থায়ী ভাবে বসবাস করে কিন্তু ইদানিং নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুষ্প কুমার দহলের (প্রচন্ড) নেতৃত্বে মাওবাদীরা মূলস্রোতে চলে আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই ভারত-নেপাল সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং হ্যাঁ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্তও। একদিকে ভারতপন্থী নেপালি কংগ্রেস অন্যদিকে চীনপন্থী মাওবাদী ও অন্যান্য বামপন্থী দলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গেছে নেপালের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আম-নেপালি জনমানসও। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই নেপালি মাওবাদীদের সাথে ভারতের মূল ভূখণ্ডের মাওবাদীদের সম্পর্ক অতি প্রাচীন এবং নেপাল করিডর দিয়েই চীন থেকে আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনেশন ভারতীয় মাওবাদীদের হাতে এসে পৌঁছয় এমনটা অনুমান অধিকাংশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের। নেপালে এই মুহূর্তে সাধারণ নির্বাচন চলছে এবং বিমল গুরুঙের নেতৃত্ব দার্জিলিঙে চলছে পৃথক রাজ্যের দাবিতে জঙ্গি আন্দোলন – এটা কি শুধুই একটা সমাপতন? শিলিগুড়ি করিডরকে “চিকেন্স নেক” বলা হয় প্রতিরক্ষার ভাষায় এই মুর্গির গর্দানে চীনের সামরিক নেতৃত্বের নজর দীর্ঘদিন ধরে। নেপালে মোটামুটি ভাবে একরকম চীনের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্তত প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এমতাবস্থায় এমন একটি ভৌগোলিক এলাকা যার সাথে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত জড়িত ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে বা ধরি প্রস্তাবিত গোর্খাল্যান্ড রাজ্য বাস্তবায়িত হলেও সামরিক দিক থেকে সব থেকে বেশি লাভবান হবে চীন। নেপালি জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে গোর্খাল্যান্ড তৈরি হলে স্বাভাবিক ভাবেই নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব গোর্খাল্যান্ডে পড়বে। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করবে এমন একটি স্থানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যার সাথে সরু সুতোয় বাঁধা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ তা অবশ্যই ভারতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নে শুভ সংকেত নয়।

দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের অন্য অনেক জেলার থেকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকটাই বিকশিত। বাংলার সবচেয়ে কুলীন কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দার্জিলিঙে রয়েছে প্রায় এক শতাব্দী ধরে। যোগাযোগ ব্যবস্থা একটু অনুন্নত মূলত পাহাড়ি এলাকা বলে। এছাড়া মানব উন্নয়নের অধিকাংশ সূচক পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে দার্জিলিংবাসী অনেক অনেক মানদন্ডে দক্ষিণ বা পশ্চিম বঙ্গের একাধিক জেলা থেকে এগিয়ে রয়েছে। মাথা পিছু আয়ও মোটামুটি ভাবে ভালো। তাই দার্জিলিং অঞ্চলের অর্থনৈতিক অনগ্রসরশীতার দাবি সত্য নয়। পাহাড়ের জনজাতির অর্থনীতি মূলত নির্ভর করে পর্যটন শিল্প এবং সরকারি চাকরির ওপর (কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি চাকরি)। ঘিসিঙের নেতৃত্বে জঙ্গি গোর্খা আন্দোলন ঠান্ডা করার জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার পাহাড়ের প্রায় সমস্ত জনজাতিকে তফশিলি উপজাতি (ST) তালিকায় নথিভুক্ত করেছিল। পাহাড়ের আজকের প্রজন্ম তফশিলি উপজাতি তালিকায় নথিভুক্ত হওয়ার ফসল তুলছে মূলত অ-পাহাড়ি উপজাতিদের শিক্ষায় অনগ্রসরতার কারণে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নিযুক্তি তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মোট খালি পদের ৮% হারে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত কোটায় অধিকাংশ চাকরি পেয়েছে পাহাড়ি উপজাতিরা যদিও অসংরক্ষিত পদগুলিতে পাহাড়ি প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার হার প্রায় শূন্য। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১% হলেও সরকারি চাকরিতে ৮% সংরক্ষণের সুযোগ পেয়ে গোর্খারা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে অনেকটা বেশিই চাকরি পেয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি বড় রাজ্যের মোট সরকারি চাকরির ৮% কিন্তু বেশ বড় একটা সংখ্যা যার বেশিরভাগটাই দখল করছে বিদ্যাশিক্ষায় উন্নত দার্জিলিংবাসীরা। গোর্খাল্যান্ড রাজ্য তৈরি হলে সেখানকার রাজ্য সরকারে প্রচুর খালিপদ তৈরি হবে এবং হাজার হাজার পাহাড়বাসী চাকরি পাবে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। প্রস্তাবিত গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের পরিধি এতটাই ছোট হবে যে একটা গোটা রাজ্য একটা পূর্ণ লোকসভা অঞ্চলকেও সঙ্কুলান যাবে না। দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের কথা বলছি যার একটা বড় অংশ সমতলের বাঙালি অধ্যুষিত শিলিগুড়ি অঞ্চলে রয়েছে। তাহলে এত ছোট রাজ্যে নতুন বিধানসভা ভবন, নতুন উচ্চ আদালত, নতুন সচিবালয় তৈরি করার পরেও এত অর্থনৈতিক সংস্থান হবে কি করে যে বড় সংখ্যক কর্মচারীকে চাকরি দিতে পারে? শুধু তাই নয় গোর্খাল্যান্ড তৈরি হলে আগামি দশ-বারো বছর সম্ভবত রাজ্য সরকারের পক্ষে আদৌ কোন রিক্রুটমেন্ট করা সম্ভবই হবে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা বড় রাজ্যে আদিবাসী কোটায় হাজার হাজার পাহাড়বাসী এই মুহূর্তে কর্মরত। নতুন রাজ্য গঠিত হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সমস্ত পাহাড়বাসী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীদের বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে যে তারা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের চাকরি করতে চায় না নবগঠিত গোর্খাল্যান্ড সরকারের অধীন কাজ করতে চায়? স্বাভাবিক ভাবেই অধিকাংশ মানুষ নিজের ভূমিতেই চাইবে ফিরে যেতে। হাজার হাজার পাহাড়ি রাজ্য সরকারি কর্মী ফিরে গিয়ে গোর্খাল্যান্ড সরকারের অধীন চাকরি নিলে আগামী দশ-বারো বছর কি ভাবে নতুন পদ সৃষ্টি করবে গোর্খাল্যান্ড প্রশাসন বা বর্তমান পদে চাকরি দেবে? শুধু তাই নয় পাহাড়ের আগামী প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভয়াবহ ভাবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোন একটি রাজ্যের তফশিলি জাতি বা উপজাতির প্রার্থীরা অন্য রাজ্যের সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে চাইলে কেবল নির্ধারিত অসংরক্ষিত পদগুলির জন্যই আবেদন করতে পারে। অন্য ভাষায় বলতে গেলে ভিন রাজ্যের তফশিলি জাতি বা উপজাতির চাকুরীপ্রার্থীদের জাতিভিত্তিক কোন অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না সরকারি চাকরির নিযুক্তিতে। পাহাড়ি বন্ধুদের মেধাকে অশ্রদ্ধা না করেই বলছি সাধারণ প্রার্থী (অসংরক্ষিত) হিসেবে তাদের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীন চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্তত গত কয়েক বছরে প্রকাশিত যে কোন রাজ্য সরকারী চাকরির মেধাতালিকা পর্যালোচনা করলে তাই মনে হয়। অতএব কি দাঁড়ালো, নিজের রাজ্যে চাকরির দরজা প্রায় বন্ধ আবার পশ্চিমবঙ্গেও চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব! ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদরা সরল পাহাড়বাসীকে এই সম্ভাবনার কথা বোঝাবে না, সাধারণ মানুষকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে তাদের বোঝানোর দায়িত্ব।

শুধু তাই নয় পাহাড়ের পর্যটন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভয়ানক ভাবে। দার্জিলিঙের অধিকাংশ পর্যটক আজও বাঙালি। মোর্চার আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের পর থেকেই প্রচুর বাঙালি পর্যটক দার্জিলিংকে বাইপাস করে দার্জিলিঙের ওপর দিয়েই নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসাবে বেছে নিয়েছে সিকিমকে। বাংলা-বাঙালি বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে নতুন গোর্খাল্যান্ড রাজ্য আত্মপ্রকাশ করলে লাখ লাখ বাঙালি পর্যটক দার্জিলিংকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা শুরু করলে আমি অন্তত একবিন্দুও আশ্চর্য হবো না। পাহাড়ে কাজ হারাবে পর্যটন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এবং ভারতবর্ষের বুকে জন্ম নেবে কেন্দ্রের ভর্তুকিতে চলা আরও একটি “বিমারু রাজ্য”।

মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য ধ্বংস হতে চলেছে পাহাড়ের কয়েকটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। গোর্খা-বাঙালি বিভাজন আজ জাতিবিদ্বেষের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভারতীয় সেনার একটি এলিট বাহিনী সমস্ত প্রটোকল ভেঙে প্রায় যুদ্ধ ঘোষণা করতে চলেছে একটি রাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে, অন্যদিকে পীতবর্ণ খর্বাকৃতি তির্যকদৃষ্টি গোর্খাদের প্রতি তীব্র বর্ণবৈষম্য খোলশ ছাড়িয়ে বেড়িয়ে আসছে প্রগতিশীল বাঙালি সমাজের অভ্যন্তর থেকে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের প্রতি মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী ভারতীয়দের এই বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব বরাবরই ছিল কিন্তু তার বিকট বহিঃপ্রকাশটা নতুন। পরিস্থিতি কোন পথে এগোবে জানি না তবে হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর দমন নীতি কোন সমাধানসূত্র দিতে পারবে না বলেই মনে হয়।
©বিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *