অভিমানের আগুনে মিলিয়েছে হাসি, ভুল বুঝেছে মোদের পাহাড়বাসী

পাহাড় জ্বলছে,বিরোধীরা হাসছে,এর নামই কি রাজনীতি ?সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ , পশ্চিবঙ্গের প্রধান বিরোধী দলগুলির আচরণ দেখে আমরা অবাক হচ্ছি,প্রধান বিরোধী দলগুলির প্রত্যেকেই বলছে আমরা গোর্খাল্যান্ড-এর বিরোধী,কিন্তু (তৃণমূল নেত্রীর নয়) মুখ্যমন্ত্রীর সর্বদল বৈঠকে না গিয়ে রাজ্যবাসীকে কিসের বার্তা দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি ?পাহাড়ের সমস্ত বিরোধী দলগুলি (জি এন এল এফ, হরকা বাহাদুর ছেত্রী-র দল ) মাত্র ২-৩ টি মিটিং এর পরই এক হতে পারে কিন্তু প্রধান বিরোধী দলগুলি বিষয়টিতে সহ মত পোষন করলেও সংকীর্ণ রাজনীতির স্বার্থে শাসক দলের বিরোধিতা করে চলছে,  কবে আমরা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে, বঙ্গবাসীর  ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে এই নোংরা রাজনীতির ঊর্ধে উঠতে পারবো? রাজনীতি শুধু বিরোধিতা করা শেখায় না, সাধারণ মানুষের স্বার্থে একজোট হওয়া ও  গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতির  লক্ষণ, তাই যদি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সবাই এক হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারি ,তবে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দলগুলি এক হয়ে কেন সমস্বরে বলতে পারছি না ,আর নয় বঙ্গভঙ্গ,দার্জিলিং আমাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ |

প্রথমেই আসি পাহাড়বাসীদের প্রতি, আমিও পাহাড়বাসীদের সাথে একমত যে তাদের এবং পাহাড়ের দিকে রাজ্য সরকারের আরো নজর দেওয়া উচিত ছিল, দীর্ঘ দিনের অনুউন্নয়ন ও পাহাড়বাসীদের প্রতি রাজ্যসরকারের উদাসীনতা অন্যতম ক্ষোভের কারণ, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না,  শুধুমাত্র প্রচারের ঢক্কনিনাদে কোনো জাতিস্বত্তাকে বেশিদিন ভুলিয়ে রাখা যায় না, আজ যে দার্জিলিং  জ্বলছে তা শুধুমাত্র কিছু পাহাড়বাসী দুস্কৃতির কাজ নয়, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা বা গোর্খাল্যান্ড-এর  পক্ষে যে সমর্থন, প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ তা রাতারাতি গঠিত হতে পারে না, তাই পাহাড়বাসীদের ক্ষোভের প্রশমন করতে কার্যকারণ বিশ্লেষন করা উচিত এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত |

পাহাড়বাসীদের প্রতি আবেদন আপনারা ক্ষোভ যুক্তিসঙ্গত হলেও আপনাদের এই সহিংস আন্দোলন রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতার সামিল, যেমন অনেক সময় মায়ের উপর অভিমান হয় কিন্তু  তা বলে কি মাকে আমরা মারধর বা ত্যাগ করতে পারি ? আপনাদের এই সহিংস আন্দোলনের জেরে যে প্রাণগুলি বলি গেল, তাদের কি আপনারা আবার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারবেন?  তাই  সহিংস আন্দোলন ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসুন, কোনো শর্ত দিয়ে নয়, যে কোনো শর্তই আলোচনার অন্তরায়, পাহাড়ে আজ সেনা এসেছে আপনাদের এই সহিংস আন্দোলনের জেরে, অহিংস আন্দোলন গনতান্ত্রিক মানুষের হাতিয়ার, কিন্তু সহিংস আন্দোলন রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা, এটা দয়া করে মনে রাখুন, আপনারা বীরের জাতি, আপনাদের বুদ্ধির তারিফ সারা পৃথিবীময়, আপনাদের জাতিসত্তার প্রতি ভারতবাসীর শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের উপর কেউ নয়, আমরা কেউ নই, তাই অনুরোধ রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতার পথে না গিয়ে আলোচনার টেবিলে বসুন |

এতখানি পড়ে হয়ত অনেকে ভাবছেন লেখক হয়ত তৃণমূলের সমর্থক, পাঠকদের জানাই তারা সম্পুর্ন ভুল ভাবছেন, আমি সমর্থক শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের, যার আর টুকরো হতে দিতে পারি না, আমাদের জন্মভূমির আর ব্যবচ্ছেদ আমরা মানবো না, এবার আসি তৃণমূলের কথাতে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসাবে বিগত কয়েক বছরে তৃণমূল পাহাড়ে প্রভূত উন্নতি করছিল, কিন্তু তৃণমূলের নেতারা ভুলে গেলেন, পাহাড়ে সমতলের রাজনীতি অচল, টাকাপয়সা বা ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে পাহাড়ি জাতিস্বত্তাকে কেনা যায় না, পাহাড়ের মানুষের মন পেতে প্রচারের ঢক্কনিনাদ নয়, দরকার ছিল প্রকৃত উন্নয়নের, আগে ত পাহাড়বাসীর মন জয় করুন, তারপর রাজনীতি করুন না, কেউ বারণ  করতো না, কিন্তু আপনারা মিরিক জয় করেই ভাবলেন আপনারা পাহাড়ের মন পেয়ে গেছেন, তা যে কতটা ভুল তা ত এখন টের পাচ্ছেন, পাহাড়ে এখন কেউ আপনাদের পাশে নেই এমনকি আপনাদের দলের লোকেরাও নেই, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব এতেই প্রকাশ পায়, পাহাড়ে ক্ষমতা দখলের এত বেশি ছটফটানি আপনাদের পক্ষে কাল হল এটা বুঝতে পারছেন ত ? আপনারা ক্ষমতায় আছেন বলে আপনারা নিজের মর্জিমাফিক চলতে পারেন না, প্রাচীন প্রবাদ “বেশী ক্ষমতার সাথে আসে বেশী দায়িত্ববোধ”, আপনারা সেটা ভুলে ক্ষমতার প্রয়োগ করে পাহাড়বাসীদের কিনে নিতে চাইলেন, অর্থ বা ক্ষমতা দিয়ে পাহাড়বাসীদের কেনা যায় না, তাদের সরল মন কেনা যায় ভালোবাসা, আন্তরিকতা দিয়ে যেমন মা তার ছেলেমেয়েকে নি:র্স্বার্থভাবে ভালবাসে |

বামপন্থীরা যে ভবিষ্যতে ক্রমেই সাইনবোর্ডে পরিনত হবে তা তাদের আচরন দেখলেই বোঝা যাচ্ছে,যারা বরাবর গোর্খাল্যান্ড গঠনের বিরোধিতা করেছে তারা কেন এই প্রশ্নে একজোট হতে পারছে না ? শুধুমাত্র বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করা যে মূর্খামি তা কি সোনিয়া গান্ধী বা রাহুল গান্ধীর রাজনীতি দেখে বামপন্থীরা বুঝতে পারছেন না, রাজ্যবাসীর মনের কথা বুঝতে আপনারা যে অনেকদিন  আগেই ফেল করেছেন, সেটা ত বুঝুন, যদিও আপনাদের কাছ থাকে রাজ্যবাসীর কোনো আকাঙ্ক্ষাই নেই, তবু আপনাদের রাজ্যে টিকে থাকার স্বার্থে, নোংরা রাজনীতি না করে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে , পাহাড়বাসী থেকে সুন্দরবনের মানুষদের স্বার্থে, শ্রমজীবী মানুষদের স্বার্থে, কৃষকদের স্বার্থে কোনো কোনো বিষয়ে রাজ্য সরকারের সাথে একমত হলেও আপনাদের অস্তিত্ব এর থেকে আর বেশী বিপন্ন হবে না, আর যদি এই কথা না মেনে নিজেদের উর্বর মস্তিস্ক কাজে লাগান তাহলে কালের করাল গ্রাসে বামপন্থীরা বিলীন হয়ে যাবে একথা লিখে নিন |

পাঠকরা নিশ্চয়ই এতক্ষনে ধরে নিয়েছেন লেখক বিজেপির সমর্থক, আসল অসুখ আমাদের মনে, আজকের পৃথিবীতে আমরা সবাইকে একটা লেবেল মেরে দিই, ও এই কথা বলছে তা হলে নিশ্চয়ই অমুক দলের লোক, বর্তমান জগতে নিরপেক্ষ লোকের কোনো জায়গা নেই, তাই পাঠকবর্গ, আমার অনুরোধ দয়া করে কুয়োর ব্যাঙ হবেন না, পরমহংস হোন, যে দুধ জলে মিশে থাকলেও শুধু দুধটুকু গ্রহন করে |

এবার আসি বর্তমানের উদীয়মান দল বিজেপির ব্যাপারে, যদিও ভোটের ফলাফলের নিরিখে কতটা উদীয়মান তা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ জাগে তবুও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করছে | বিজেপির সবচেয়ে বড় অসুবিধা, দলে রাজনৈতিক  প্রজ্ঞাসম্পন্ন কেউ নেতৃত্বে নেই, বর্তমান রাজ্য সভাপতি যে রাজনৈতিক ঘরানার লোক নন, তা তার অতি বড় বন্ধুও স্বীকার করবে, রাজনীতি একটা শিল্প, সেখানে স্বর্ণকারের ঠুকঠাক চলে, কামারের গদাম গদাম হাতুড়ির ঘা চলে না, এই কয়দিনের পর্যবেক্ষনের পর বুঝতে পেরেছি  সিধান্তহীনতাই  রাজ্য সভাপতির দুর্বল জায়গা আর রাজনীতিতে এটাই সবচেয়ে বেশী জরুরী, উদাহরনস্বরূপ তিস্তা জলচুক্তি কেন্দ্র করবে, পাহাড়ের ব্যাপারে কেন্দ্র সিধান্ত নেবে, রাজ্যের সমস্ত ব্যাপারে যদি কেন্দ্র সিধান্ত নেবে তাহলে আপনি কেন সভাপতি পদ অলংকৃত করে বসে আছেন? কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকেই জায়গাটা ছেড়ে দিন, আপনি ভুলে যান কেন্দ্রে বিজেপি আছে, আপনি রাজ্যে রাজ্যবাসীর স্বার্থে আপনার দ্বায়িত্ব পালন করুন, রাজ্যের ব্যাপারে যদি কেন্দ্রীয় সরকারের বিপক্ষে যেতে হয়, তাও যান, তাহলেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আপনাকে নেতা হিসাবে মান্য করবে, না হলে বলবে কেন্দ্রের ধামাধরা লোক বা কেন্দ্রের দালাল, কোনটা আপনার পছন্দ সেটা সম্পুর্নরূপে আপনার ব্যাপার, আর একটি অনুরোধ দয়া করে রাজনৈতিক ব্যক্তির মতো কথা বলার চেষ্টা করুন, পাহাড় জ্বলছে, আর আপনি বলছেন কেমন দিলাম ? এটাই কি রাজনীতি? আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি একটা সংবিধান স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সভাপতি ? আপনি পাহাড়ের অসংখ্যা মানুষের বিপদের কথা চিন্তা করেছিলেন কি একথা বলার সময় ? এটুকু বিচক্ষণতার আশা আমরা নিশ্চয়ই করতে পারি নাকি বলবেন “হাতি চলে বাজার, কুত্তে ভৌকে হাজার” , কিন্তু ভুলে যাবেন না সেই কুকুর-ই কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড়  বন্ধু, তাই বিজেপিকে অনুরোধ এই ব্যাপারে অন্তত:  একজোট হয়ে রাজনৈতিক শুভবুদ্ধির পরিচয় দিন |

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে আমার উদার্ত কন্ঠে আহ্বান, সমস্ত লড়াই ভুলে এই একটা ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হই, মাতৃস্বরূপ জন্মভূমিকে আমরা টুকরো হতে দেব না, পাহাড়বাসীরাও আমাদের ভাই, ভাই হয়তো কোনো কারনে আমাদের ভুল বুঝেছে, তা বলে আমরা তাদের ভুল বুঝে দুরে ঠেলে দিতে পারি না, তাদেরকে আপন করে নিতে হবে, তবেই আসমুদ্র হিমাচল পশ্চিমবঙ্গ তার পূর্ণতা পাবে |

ইতি

অবিবেচক বাতুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *